বন্যা

বন্যার কারণ কী এবং বন্যার প্রতিকার সমূহ

বন্যা কাকে বলে ? বন্যা কি ?

বন্যা বলতে সাধারণ অর্থে নদী, খাল, বিলে স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে অধিক পানি প্রবাহিত হয়, যার দরুন মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও দুঃখকষ্টের কারণ হয়, তখন তাকে বন্যা বলা হয়। বন্যার ফলে বন্যাকালীন সময়ে মানুষ নানারকম রােগে আক্রান্ত হলে মহিলারা নানা রকম স্থানীয় ঔষধি ঘাস লতাপাতা দিয়ে চিকিৎসা করে। ডায়রিয়া হলে ঘরে তৈরি সেলাইন (শুড়, লবণ, বিশুদ্ধ পানি) এর মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।

বন্যার প্রকারভেদ

  1. আকস্মিক বন্যা – Flash flood
  2. বৃষ্টিজনিত বন্যা – Rain water flood
  3. মৌসুমি বন্যা – Monsoon flood
  4. সমুদ্র তীরবর্তী বন্যা – Coastal flood

 

আকস্মিক বন্যা – Flash flood : বর্ষা মৌসুম ছাড়া অন্য কোন মৌসুমে আকস্মিকভাবে বৃষ্টিপাতের ফলে যে বন্যার সৃষ্টি হয়, তাকে আকস্মিক বন্যা বলে। আকস্মিকভাবে এ বন্যার সৃষ্টি হয়, এ কারণে এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। সাধারণত বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পূর্বে এ বন্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এবং সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে এ বন্যার সৃষ্টি হয়। আকস্মিক বন্যাকে আবার কয়েকভাবে ভাগ করা যায়। যেমন- স্বাভাবিক বন্যা, প্রবল বন্যা, মারাত্মক বন্যা এবং মহাপ্লাবন ।

বৃষ্টিজনিত বন্যা – Rain water flood : বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের ফলে যে বন্যার সৃষ্টি হয়, তাকে বৃষ্টিজনিত বন্যা বলে। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে নদীনালা, খালবিল, মাঠঘাট প্রভৃতি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। এ বন্যার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টিজনিত বন্যা সংঘটিত হয়েছে।

মৌসুমি বন্যা : Monsoon flood : নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে যে বন্যার সৃষ্টি হয়, তাকে নদী বন্যা বা মৌসুমি বন্যা বলে। বিশ্বের নদীপ্রধান দেশসমূহে মৌসুমি বন্যা বেশি দেখা যায়। মৌসুমি বন্যা সাধারণত বর্ষা মৌসুমে (জুন-সেপ্টেম্বর) প্রচুর বৃষ্টিপাতে। নদীর পানি অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে ঘটে থাকে। এছাড়াও নদীতে তুষার গলনসহ বিভিন্ন কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ ও ২০০৭ সালের বন্যায় নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সংঘটিত হয়।

সমুদ্র তীরবর্তী বন্যা – Coastal flood : সাগরের তীরবর্তী এলাকায় যে বন্যার সৃষ্টি হয়, তাকে ঘূর্ণিঝড় বা সাগর বন্যা বলা হয় । ঘূর্ণিঝড়, সুনামি বা অন্যান্য কারণে সাগরের পানি বৃদ্ধির ফলে এ বন্যার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সাগরের তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও সাগরের তীরবর্তী এলাকায় ১৯৯১ ও ২০০০ সালে এ বন্যার সৃষ্টি হয়।

বন্যার কারণ কী এবং বন্যার প্রতিকার সমূহ ?

  • উজানের দেশসমূহ থেকে আসা প্রচুর পানি।
  • দেশের প্রধান তিনটি নদী অববাহিকায় একসাথে পানি বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের সংমিশ্রণ।
  • স্বল্প সময়ে অধিক পরিমাণ পানির চাপ।
  • উজানের দেশসমূহের হাজার হাজার মাইল ডাইক নির্মাণের ফলে দ্রুত পানি বাংলাদেশে চলে আসা।
  • নদী, খাল, জলাশয়ের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া।
  • নদীপথের গতি পরিবর্তন হওয়া।
  • নদী ও খালের পাড় ভরাট হয়ে/করে ক্রমাগত পানির নির্গমন পথ সরু হয়ে যাওয়া।
  • পানি প্রবাহ/নিষ্কাশনে বাধা।

বাংদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ার ভাটা বিস্তার জোয়ার ভাটা সৃষ্ট বন্যার প্রভাবসমূহ

  • জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
  • বন্যার কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পায়।
  • মানুষ বাস্তুহীন হয় এবং উপকূলীয় এলাকা হতে স্থানান্তরিত হয়ে শহরাঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি ঘটায়।
  • মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে এবং নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, যেমন— চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক, চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়।
  • মানুষ সুপেয় পানির অভাবে নানারকম পানিবাহিত রােগ, যেমন- ডায়রিয়া, বসন্ত, কলেরা, জন্ডিস, টাইফয়েডসহ অন্যান্য মারাত্মক রােগে আক্রান্ত হয়।

জোয়ার ভাটার বন্যা প্রতিরোধের উপায়

  1. পরিকল্পিত বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ ।
  2. বিভিন্ন স্থানে প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগানাে ও বনাঞ্চল তৈরি করা।
  3. বন্যাসহিষ্ণু ফসলের চাষ করা।
  4. সম্ভব হলে বিগত বন্যা সৃষ্ট এলাকায় জনবসতি গড়তে না দেয়া।
  5. বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
  6. ফ্লাড গ্রুফিং পদ্ধতি গ্রহণ (ভিটাবাড়ির আঙিনা, টিউবওয়েলের পাইপ, গ্রাম্য পায়খানা, পুকুরপাড়, কবরস্থান, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বাজার ইত্যাদি উঁচু করা)।
  7. মাইকিং অপসারণ উদ্ধার এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু রাখা।

বন্যার পূর্ব প্রস্তুতির স্থানীয় কৌশল বা পূর্বে করণীয়

পানি মাপার খুটি তৈরি করা : একটি লম্বা এবং সােজা বাঁশে ২ ইঞ্চি পর পর রং বা আলকাতরা দিয়ে দাগ কাটা হয়। বন্যার পানি বাড়ার সময় ঘরের পাশে বা উঠানে খুঁটিটি পুঁতে রাখা হয়। কিছুক্ষণ পর পর খুঁটিটি দেখতে হয় । খেয়াল রাখতে হয় পানি কতটুকু বাড়ছে। পানি খুব দ্রুত বাড়তে থাকলে নিরাপদ জায়গার সন্ধান করে সেখানে আশ্রয় নিতে হয়।

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা : বন্যার পানির উচচতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে ঘরের বাসিন্দারা ঘরের চালের উপর উঠে যায় । প্রয়ােজনে খুঁটির সাথে বাধা দড়িগুলাে কেটে দেয়। ফলে পানির উচ্চতা যতই বৃদ্ধি পায় আরােহীসহ চালটি ভেলার মতাে প্লবনের পানির উপর ভাসতে থাকে।

টিউবওয়েল সংরক্ষণ : টিউবওয়েলের উপরের অংশ খুলে ফেলা হয়। তারপর পলিথিন দিয়ে মুড়ে কলের গােড়া বেঁধে রাখা হয়। পাইপ জোড়া দিয়ে টিউবওয়েল উঁচু করে রাখতে হয়।

শুকনা খাবার সংরক্ষণ : মােটা ও শক্ত পলিথিনের ব্যাগ, টিন, বড় প্লাস্টিকের বয়াম ইত্যাদিতে শুকনা খাবার (চিতা, মুভি, খৈ, ছাতু, গুড় ইত্যাদি) রেখে চালের নিচে উঁচু জায়গায় শক্ত করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

জ্বালানি সংরক্ষণ : ঘরের চালে অথবা গাছের ডালে জ্বালানি শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়, যার ফলে বন্যার সময় জ্বালানির অভাব দূর হয় এবং শােলা জাতীয় জ্বালানি সহজে জ্বালানাে যায়।

খড়ের বােঝা সংরক্ষণ : উঁচু গাছে খড়ের বােঝা শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়, যার ফলে বন্যা ও বন্যা পরবর্তী সময়ে গরু ছাগলের খাওয়ার অভাব দূর করা যায় এবং প্রয়ােজনে জ্বালানি অথবা ঘরবাড়ি মেরামতের কাজে ব্যবহার করা যায় ।

ঘােট ঘােট জলযান তৈরি করা : তাল গাছ দিয়ে ডিঙি নৌকা বানানাে হয়, কলাগাছের ভেলা তৈরি করা হয়। ফলে বন্যার সময়ে মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও গরু-ছাগল বহনের কাজে ব্যবহার করা হয়।

গৃহপালিত পশুদের নিরাপত্তা : গৃহপালিত পশুদের উঁচু কোন জায়গায় রেখে আসা হয়, তা সম্ভব না হলে গরু, মহিষ, | ছাগল, ভেড়ার দড়ি কেটে দেওয়া হয়। ফলে গৃহপালিত পশুরা নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে পারে এবং বিপদ কেটে গেলে মালিকেরা পশুদের যথাসম্ভব সংগ্রহ করে।

দলগঠন করা : বন্যার সময় সবাই দলগতভাবে বন্যা মােকাবিলা করে এবং একে অপরকে সাহায্য করে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ।

বন্যাকালীন সময়ে করণীয় ব্যবস্থা

  1. বন্যার সময় ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করে প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে ।
  2. বন্যায় যদি বাড়িঘর ডুবে যায়, নিকটস্থ কোন উচু স্থানে বা বাঁধে অথবা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে ।
  3. নিজ বসতবাড়িতে অবস্থান করা সম্ভব না হলে, বাড়ির কাছাকাছি কোথাও অবস্থান করতে হবে। প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্র ঘরের চালের নিচে পাটাতনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
  4. কোনােমতেই দালালও টাউটদের পরামর্শ শুনে নিজ গ্রাম ছেড়ে পরিবার-পরিজনসহ শহরে যাওয়া যাবে না। নিজ গ্রামে থাকা কোনাে মতেই সম্ভব না হলে, পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহে, যা বন্যাকবলিত নয়, আশ্রয় গ্রহণ করতে হৰে ৰা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক স্থাপিত আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে।
  5. টিউবওয়েলের পানি পান করতে হবে। টিউবওয়েলের পানি পাওয়া না গেলে পানি ফুটিয়ে পান ব্রতে হয় অথবা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বা ফিটকিরি ব্যবহার করতে হবে।
  6. বন্যার সময় বিভিন্ন রােগ দেখা দিতে পারে। এগুলাের প্রতিষেধক টিকা ইনজেকশন গ্রহণ করতে হবে।
  7. নিজ এলাকায় কার্যরত মেডিক্যাল টিমের অবস্থান সম্বন্ধে জেনে নিতে হবে এবং প্রয়ােজনে তাদের সাহায্য নিতে হবে।
  8. নিজ ঘরে রক্ষিত কার্বলিক অ্যাসিডের বােতলের ছিপি খুলে রাখতে হবে। এতে সাপ আপনার ঘরে ঢুকবে না। তাই তা কার্বলিক অ্যাসিড মিশ্রিত সাবান টুকরাে ঘরের চারকোনায় ছিটিয়ে রাখলে ঘরে সাপ ঢুকবে না।
  9. সরকারি, বেসরকারি ত্রাণ বণ্টনকারীদের প্রয়ােজনীয় সহযােগিতা প্রদান করা উচিত।
  10. ত্রাণসামগ্রী যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে অভাব মিটানাের চেষ্টা করতে হবে।
  11. বন্যার পরই বন্যাকবলিত জমিতে কী ফসল ফলানাে যায়, তার চিন্তাভাবনা করতে হবে বা এ বিষয়ে কৃষি কর্মীদের সাথে আলােচনা করতে হবে।

বন্যা পরবর্তী করণীয় ব্যবস্থা

  1. বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে নিজ ভিটাবাড়িতে ফিরে আসতে হবে, ঘরবাড়ি বাসযােগ্য এবং বাড়িতে নানা ধরনের শাকসবজি চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
  2. নিজ জমি চাষাবাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষি কর্মীদের সাথে আলােচনাক্রমে স্বল্প সময়ে উৎপাদনযােগ্য ফসলের চাষ করতে হবে।
  3. এককভাবে ঋণের চেষ্টা না করে যৌথভাবে ঋণ গ্রহণের প্রচেষ্টা চালালে ভালাে ফল পাওয়া যেতে পারে।
  4. বন্যার পর পরই নানারকম রােগ (টাইফয়েড, ডায়রিয়া, আমাশয় ইত্যাদি) দেখা দিতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিষেধক ব্যবস্থা নিতে হবে।
  5. ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের জন্য স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
  6. ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের জন্য কোনাে সরকারি সাহায্য (টিন) পাওয়া যাবে কি না সে সম্বন্ধে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সাথে যােগাযােগ রাখতে হবে। এ ব্যাপারে যৌথভাবে প্রচেষ্টা চালালে ভালো হয়।
  7. বন্যার পানি নামার সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত দিঘি বা ঘেরের পাড় মেরামত করে পুকুরে জাল টেনে চাষকৃত মাছ আছে কি না। দেখে পরবর্তী শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়ােগ করে পুনরায় মাছের পােনা ছেড়ে চাষ শুরু করা যেতে পারে ।
  8. প্রয়ােজনীয় পরামর্শের জন্য উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে যােগাযােগ করা যেতে পারে। সম্ভব হলে মাছ চাষের জন্য ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যে মৎস্য কর্মকর্তার সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
  9. আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত রােপা-আমন ধানের বীজতলা পানি দিয়ে পাতায় জমে থাকা পানি বা কাদা ধুয়ে দেয়া যেতে পারে এবং পাতা শুকানাের পর কিছু ইউরিয়া সার প্রয়ােগ করা যেতে পারে।
  10. রােপা-আমন ধানের চারার সংকট হলে ইতিপূর্বে রােপণকৃত ভালাে জমি থেকে প্রতি গােছার দু’একটি কুশি ভেঙে নতুন জমিতে রােপণ করা যেতে পারে।
  11. বীজ ও চারার সন্ধানে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার (এসএসও) সাথে যােগাযােগ করা যেতে পারে।
Choose your Reaction!
Leave a Comment